রাষ্ট্রধর্ম বাতিল, আমাদের অজ্ঞানতা ও উদাসীনতা

supremecourtযেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেয়ে তার বাস্তবায়ন যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিনও বটে তা আমরা সকলেই কম বেশি জানি ও উপলব্ধি করি। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সামনে যে কঠিন লড়াইগুলো রয়েছে তার মধ্যে জঙ্গিবাদ দমন একটি অত্যন্ত বৃহৎ ইস্যু নিঃসন্দেহে। দীর্ঘদিনের আপোষকামী কর্মকান্ড বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের গোড়ায় যেভাবে পানি ঢেলে তাকে মহীরুহে পরিণত করেছে তাকে উপড়ে ফেলা সহজ নয়।

ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে উঠা এই জঙ্গিবাদ, যা সারা বিশ্বেই এখন একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা এ থেকে দেরীতে হলেও নিস্তার পাওয়ার উপায় একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি এখনো। আর এ লক্ষ্যেই একটা প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের মাধ্যমে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে জঙ্গিবাদ না চাইলেও এর দমনে করণীয় সম্পর্কে আমাদের দেশের আপামর জনসাধারণের এক ধরণের বিরূপ মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করা প্রয়োজনীয় কিনা এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে প্রথমেই বলতে হয়, রাষ্ট্র কোন ব্যক্তি নয়। রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান। হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেমন, রাষ্ট্রও তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান। ধর্ম মানুষের হয়। একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট ধর্ম পালন করতে পারে কিংবা নাও করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কোন নির্দিষ্ট ধর্ম পালন করতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্যই সমান।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গে যদি আসি, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী ব্যক্তিমাত্রই জানার কথা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটির জন্ম হয়েছিল, যে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল সেই দেশটি নির্দিষ্ট কোন ধর্মের ঝান্ডা উড়িয়ে স্বাধীন হয়নি। বরং আমাদের প্রথম যে সংবিধান তার ৪টি মূলনীতির একটি ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা। এর অর্থ হচ্ছে কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব, কিংবা কোন একটি ধর্মের অংশ হয়ে না থাকা। অর্থাৎ শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কোন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বিশেষ কোন সুবিধা পাবে না।

এই ধর্ম নিরপেক্ষতা শব্দটির অর্থ আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না। আর এই সুযোগটিই নেয় প্রতিক্রিয়াশীলেরা। যেহেতু ধর্ম নিরপেক্ষতা বহাল হলে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাই ধর্মকে নিয়ে যারা রাজনীতি করে সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের বুঝায় যে ধর্ম নিরপেক্ষ হয়ে গেলে মসজিদ থেকে উলুধ্বনি শোনা যাবে, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, মুসলিম দেশগুলোর মাঝে বাংলাদেশের নাম থাকবে না, ভারতকে খুশি করতেই এই কাজ করা হচ্ছে ইত্যাদি। আর দুঃখের বিষয়, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবী জানান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলেন, আমাদের এমন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও কোন চিন্তাভাবনা না করেই, কোনকিছু না জেনেই এদের কথার সাথে তাল মেলান। অথচ ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে মসজিদ থেকে উলুধ্বনি শোনা নয়, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে আযান দেয়া ও উলুধ্বনি দেয়া উভয়কে সমান বিবেচনা করা ও সমান অধিকার দেয়া। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে একজন মুসলমানের মুসলমান হয়ে থাকায় বাধা নেই। একজন মুসলমান যখন ইউরোপ আমেরিকায় যান, শুধুমাত্র সেসব দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম না হওয়ায় কি তার মুসলমানিত্ব খারিজ হয়ে যায়?

অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই দেশে তো এখনো সব ধর্মের মানুষ ‘সমান অধিকার’ নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই বাস করছে তাহলে সমস্যা কোথায়? সত্যি কি তাই? একজন মুসলিম যেকোন প্রতিষ্ঠানে গেলে যেভাবে নামাজ পরার জায়গা পান, একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান কি তার প্রার্থনার জন্য জায়গা পান? প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে মসজিদ নির্মাণ করা হয় সেভাবে কি অন্য ধর্মের কারো জন্য উপাসনালয় নির্মিত হয়? একজন মুসলিম ঈদে যে ছুটি পান একজন হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্ট অথবা অন্য ধর্মাবলম্বী কি তার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেই একই মাত্রায় ছুটি পান? একজন মুসলিমের কাছে নামাজ যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে তার প্রার্থনাও কি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়? একজন মুসলিমের কাছে ঈদ যতটা আকাঙ্ক্ষিত, অন্য ধর্মের অনুসারীদের কাছেও কি তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সমান আকাঙ্ক্ষিত নয়? মূলত সব ধর্মের মানুষ এখানে ‘সমান অধিকার’ নিয়ে নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপে নিজেদের অধিকার থেকে কিছুটা ছাড় দিয়ে বেঁচে আছে।

যাই হোক, স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন দমাতে মানুষের মনে ধর্মের সুড়সুড়ি দিতে শুরু করেন। মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হন যে এতে করে ইসলামের জাত চলে যাচ্ছে আর ধর্মনিরপেক্ষতাকে পরিবর্তন করে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতির খেলা খেলতে রাষ্ট্রেরও একটি ধর্ম বসিয়ে দেন। ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করার পর যাবার আগে যেমন ঠিকই ধর্মের ভিত্তিতে আমাদের আলাদা করে আমাদের অবনতি নিশ্চিত করে গিয়েছিল, ঠিক তেমনি এরশাদও নিজের পতনের আগেই এই দেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।

আজ প্রশ্ন উঠছে এই মুহুর্তে হঠাত করেই রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের প্রয়োজনীয়তা কি? কেন শুধু শুধু এর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে উস্কে দেয়া হচ্ছে? অথচ মজার বিষয় হচ্ছে এরশাদ কেন ধর্ম নিরপেক্ষতা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন করলেন সেই প্রশ্ন তাদের কারো মনে জাগছে না। সেক্ষেত্রে সবার মনে হয় কিছু তথ্য জানা প্রয়োজন। এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মনে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে নিজের মসনদ স্থায়ী করার চেষ্টা করলেও ঐ সময়েই এর বিরুদ্ধে ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক আদালতে একটা রিট করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মামলাটি দীর্ঘ ২৭/২৮ বছর ফাইলবন্দী হয়েই পড়ে থাকে। ২০১১ সালে যখন আদালত সংবিধানের বেশ কিছু অবৈধ সংশোধনীর ব্যাপারে যুগান্তকারী রায় দেয়, তারপরই ২০১১ সালে এই অষ্টম সংশোধনীর ব্যাপারে আদালতে আরেকটি স্বতন্ত্র রিট করা হয়। ১৯৮৮ সালের ও ২০১১ সালের রিট দুটিকে একসাথে করে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। মতামতের জন্যে আদালত এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছেন। আর তারই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামিকাল ২৮ মার্চ। আজ রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের পেছনে কোন দুরভিসন্ধি আছে এমন চিন্তা আমাদের সবার মাথায় উঁকি দিলেও কোন অপরাজনৈতিক চিন্তা থেকে রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করা হয়েছিল সেটা নিয়ে আমরা কেউ কেন ভাবছি না? ৩০ বছর আগেই যা আমাদের করার কথা ছিল আজ এতো বছর পরে এসেও তা করতে আমরা কেন পিছপা হবো?

রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের মাধ্যমে এরশাদ যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছিলেন তার ফলাফল যেমন আমরা এখন ভোগ করছি, তেমনি আজ রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হলে তার সুফল ভোগ করতেও হয়তো আমাদের অপেক্ষাই করতে হবে। কিন্তু একই সাথে এই যুগান্তকারী রায়ের নিকটবর্তী ফলাফল কি হবে সেই বিষয়ে সচেতন হওয়াও প্রয়োজন।শুধুমাত্র রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের মধ্য দিয়েই এই দেশকে পুরোপুরি জঙ্গিমুক্ত ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করা যাবে তা নয়। ইতোমধ্যেই সিলেটের গোলাপগঞ্জে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হিন্দুদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের সিদ্ধান্ত হলে এর পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর যে অত্যাচারের খড়্গ নেমে আসবে তা দমন করতে প্রস্তুত রয়েছে তো আমাদের সরকার ও প্রশাসন? ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যদি সহসাই নিষিদ্ধ না হয়, কেবল রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের সিদ্ধান্ত সুফল বয়ে আনবে কি? নাকি ‘অসারের তর্জন গর্জনই সার’ হবে? যদি তাই হয়, তবে এভাবে দিনের পর দিন অত্যাচারিত হয়ে ‘সংখ্যালঘু’ এর অনুপাত শূন্যের কোঠায় নেমে আসলে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল এর সিদ্ধান্তও তার মূল্য হারাবে। শুধু ধর্ম নয়, জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকেও এদেশে বাঙালির সাথে অন্যান্য সকল জাতির মানুষের ‘সমান অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে না পারলে সেই স্বৈরাচারী শক্তির ভূত থেকে আমাদের সহসাই মুক্তি মিলবে না।

Add Comment

Required fields are marked *. Your email address will not be published.